দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাশিয়ার তেল আমদানি কমালে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে। আবার আমদানি অব্যাহত রাখলে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের ঝুঁকি রয়েছে।
রাশিয়ার তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ভারত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে উত্থাপিত নতুন একটি বিল নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে রাশিয়ার তেল বড় পরিমাণে কেনা দেশগুলোর ওপর, যার মধ্যে ভারত ও চীনও রয়েছে, সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর ২০২২ সাল থেকে দেশটির কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে ভারত। এতে দেশটি কয়েক বছর ধরে বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে। তবে জ্বালানি বাণিজ্য এখন ভারতের বৃহত্তর কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে।
নয়াদিল্লি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে—এমন সতর্কতা তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আগেই জানিয়েছিল। একই সঙ্গে ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উৎস থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে ভারত।
তবে রাশিয়ার তেল কেনার অবস্থান ধরে রাখলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও চাপে পড়তে পারে। গত এক বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে একাধিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তিও কয়েক দফা পিছিয়েছে।
ভারতের দুটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন উত্তেজনার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আশা ছেড়ে দেবে নয়াদিল্লি। তবে অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক আরোপ করা হলে ভারতকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
গত বছর যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে ভারত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও একটি চুক্তি চূড়ান্ত করেছে দেশটি। কানাডার সঙ্গে আরেকটি চুক্তি চলতি বছরের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বরে জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফর করলে সেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক হতে পারে। সেই বৈঠকে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অগ্রগতির আশা করছে নয়াদিল্লি।
ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, মার্কিন শুল্কসহ বিভিন্ন কারণে গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, নতুন এই আইন ভারত ও রাশিয়ার তেল বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সম্পর্কের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপে দেরি করলে বা সীমিত পরিসরে তা কার্যকর করলে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হতে পারে। তবে প্রস্তাবিত আইনটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নয়াদিল্লির আস্থার সংকট বাড়াতে পারে এবং শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় ছাড় দেওয়ার বিষয়ে ভারতীয় আলোচকদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলতে পারে।
প্রস্তাবিত বিলটি ইতোমধ্যে ভারতের রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা মোদি সরকারের কাছে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
রাশিয়ার তেল কেনা কমিয়ে দিলে ভারতে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, যা মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আগামী বছরের শুরু থেকে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব এবং মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও গুজরাটে মোদির দল বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর ভারত রাশিয়ার তুলনামূলক কম দামের অপরিশোধিত তেল কেনা ব্যাপকভাবে বাড়ায়। বর্তমানে ভারতের মোট তেল সরবরাহের ৪০ শতাংশের বেশি আসে রাশিয়া থেকে।
রাশিয়ার তেল কেনা বৃদ্ধির বিষয়টি ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের অন্যতম কারণ ছিল বলে জানিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ওই শুল্ক কমিয়ে দেন এবং জানান, রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করা ও বাণিজ্য বাধা কমাতে ভারত সম্মত হয়েছে।
তবে ২০২৬ সালের শুরুতে ভারত অল্প সময়ের জন্য রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমালেও পরে তা আবার বেড়ে যায়। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বৈশ্বিক তেল সরবরাহে ধাক্কা লাগার পর রাশিয়ার তেলের আমদানি আরও বেড়েছে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমানোর জন্য ভারতের ওপর চাপ থাকলেও নয়াদিল্লি বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির যুক্তি, বিপুল জনসংখ্যা ও দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতির জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পরিশোধনাগারগুলো সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য যে অপরিশোধিত তেল কিনেছে, তাতেও রাশিয়ার তেল রয়েছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের দাবি, রাশিয়ার তেল কেনার অর্থ ইউক্রেনের যুদ্ধের জন্য অর্থায়ন করছে না; বরং এটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা ও ভারতের সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হলে ভারতীয় রপ্তানিকারক ও মার্কিন ভোক্তা—উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে এটি বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটাবে এবং বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত ক্ষমতা তৈরি করবে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/